মাযার নির্মাণ 03
জরুরি জ্ঞাতব্য: ওহাবীরা ধূর্ততার সাথে এই বইটির মধ্য থেকে ‘ওহাবী’ শব্দটি অপসারণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা হাতে-নাতে ধরা পড়ে যায়। আল্লাহতালা-ই ইসলামী জ্ঞানকে হেফাযত করেন।
অন্যান্য দলিলসমূহ
দলিল নং – ১
আমরা এবার ‘কবরের আকার-আকৃতি’ বিষয়টির ফয়সালা করবো।
হযরত আবূ বকর বিন আইয়াশ (রা:) বর্ণনা করেন: হযরত সুফিয়ান আত্ তাম্মার (রা:) আমাকে জানান যে তিনি মহানবী (দ:)-এর রওযা মোবারককে উঁচু ও উত্তল দেখতে পেয়েছেন।— সহীহ বোখারী, ২য় খণ্ড, ২৩তম বই, হাদীস নং ৪৭৩
অতএব, মাযার-রওযা ভেঙ্গে ফেলা বা গুঁড়িয়ে দেয়া ‘সালাফী’দের দ্বারা ‘নস’ বা শরয়ী দলিলের চরম অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছুই নয়।
মহান হানাফী মুহাদ্দীস ইমাম মোহাম্মদ ইবনে হাসসান শায়বানী (রহ:) এতদসংক্রান্ত বিষয়ে গোটা একটি অধ্যায় বরাদ্দ করে তার শিরোনাম দেন ‘কবরের ওপর উঁচু স্তূপাকৃতির ফলক ও আস্তর’। এই অধ্যায়ে তিনি নিম্নের হাদীসটি লিপিবদ্ধ করেন:
ইমাম আবূ হানিফা (রহ:) আমাদের কাছে হযরত হাম্মাদ (রহ:)-এর কথা বর্ণনা করেন, তিনি হযরত ইবরাহীম (রা:)-এর কথা উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন, কেউ একজন আমাকে জানান যে তাঁরা মহানবী (দ:), হযরত আবূ বকর (রা:) ও হযরত উমর (রা:)-এর মাযার-রওযার ওপরে ‘উঁচু স্তূপাকৃতির ফলক যা (চোখে পড়ার মতো) বাইরে প্রসারিত ছিল তা দেখতে পেয়েছিলেন এবং তাতে আরও ছিল সাদা এঁটেলমাটির টুকরো।
ইমাম মোহাম্মদ (রহ:) আরও বলেন
আমরা (আহনা’ফ) এই মতকেই সমর্থন করি; মাযার-রওযা বড় স্তূপাকৃতির ফলক দ্বারা চিহ্নিত করতে হবে। কিন্তু তা বর্গাকৃতির হতে পারবে না। এটি-ই হচ্ছে ’ইমাম আবূ হানিফা (রহ:)-এর সিদ্ধান্ত’।— কিতাবুল আসা’র, ১৪৫ পৃষ্ঠা, Turath Publishing কর্তৃক প্রকাশিত
সীমা লঙ্ঘনকারীরা দাবি করে, সকল মাযার-রওযা-ই গুঁড়িয়ে দিতে বা ধ্বংস করতে হবে। এটি সরাসরি সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা, তারা যে হাদীসটিকে এ ক্ষেত্রে অপপ্রয়োগ করে, তা মুশরিকীন (অংশীবাদী)-দের সমাধি সম্পর্কে বর্ণিত, মো’মেনীন (বিশ্বাসী মুসলমান)-দের কবর সম্পর্কে নয়। মাযার-রওযা নির্মাণ বৈধ, কারণ রাসূলুল্লাহ (দ:), সর্ব-হযরত আবূ বকর (রা:) ও উমর ফারূক (রা:) এবং অন্যান্য সাহাবা (রা:)-দের মাযার-রওযা উঁচু স্তূপাকৃতির ফলক দ্বারা নির্মিত হয়েছিল মর্মে দলিল বিদ্যমান। আমরা জানি, ওহাবীরা চিৎকার করে বলবে আমরা কেন ইমাম মোহাম্মদ (রহ:)-এর বইয়ের পরবর্তী পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি দেই নি, যেখানে তিনি কবরে আস্তর না করার ব্যাপারে বলেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে তিনি তাতে সাধারণ কবরের কথা-ই বলেছিলেন, আম্বিয়া (আ:) ও আউলিয়া (রহ:)-এর মাযার-রওযা সম্পর্কে নয়, যেমনিভাবে ইতিপূর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমরা এখানে কিছু ছবি দেখাতে চাই যা’তে দৃশ্যমান হয় যে মুশরিকীন/খৃষ্টানদের সমাধি এমন কি তাদের দ্বারাও (মাটির সাথে) ‘সমান’ রাখা হয় (অতএব, ইসলামী প্রথানুযায়ী মুসলমানদের কবর মাটির সাথে সমান নয়, বরং উচুঁ স্তূপাকৃতির ফলক দ্বারা মাটি থেকে ওপরে হওয়া চাই)। তবে খৃষ্টান সম্প্রদায় মরিয়ম ও যিশুর মূর্তি তাদের মৃতদের সমাধিতে স্থাপন করে যা ইসলাম ধর্মমতে নিষেধ। [অনুবাদকের নোট: এই ছবিগুলো অনুবাদশেষে পিডিএফ আকারে মিডিয়াফায়ার ও স্ক্রাইব্ড সাইটে প্রকাশ করা হবে, ইনশা’আল্লাহ]
মুসলমানদের কবর ও মুশরিকীন (অংশীবাদী)-দের সমাধির মধ্যকার পার্থক্য বোঝার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছবি
(ক) প্রথম ছবিটিতে দেখা যায় খৃষ্টানদের সমাধি সম্পূর্ণভাবে মাটির সাথে মেশানো তথা মাটির সমান, যা ওহাবীরা আমাদের বিশ্বাস করতে বলে এই মর্মে যে, মুসলমানদের কবরও অনুরূপ হওয়া উচিত। [কিন্তু বেশ কিছু হাদীসে ইহুদী ও খৃষ্টানদের বিপরীত করতে আমরা আদিষ্ট হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে মুসলমানদের কবর পাকা হওয়া উচিত; তবে কোনো মূর্তি ওর ওপরে নির্মাণ করা চলবে না]
(খ) দ্বিতীয় দুটি ছবিতে স্পষ্ট হয় যে খৃষ্টানগণ ‘সমাধির ঠিক ওপরে মূর্তি নির্মাণ করেন’। অথচ মুসলমান সূফী-দরবেশদের মাযার-রওযার ঠিক ওপরে ইমারত (অবকাঠামো) নির্মিত হয় না, বরং তাঁদের মাযার-রওযাগুলো দালান হতে পৃথক, যেটি বিভিন্ন হাদীসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যে হাদীসগুলো এমন কি ওহাবীরাও অপপ্রয়োগ করে থাকে।
পবিত্র রওজা শরীফ
পক্ষান্তরে, নিচের ছবিগুলো ইসলামের অত্যন্ত পবিত্র স্থানসমূহের, যা’তে অন্তর্ভুক্ত মহানবী (দ:), সাইয়েদুনা আবূ বকর (রা:) ও সাইয়েদুনা উমর ফারূক (রা:)-এর মোবারক রওযাগুলো, যেগুলো নির্মিত হয়েছিল বহু শতাব্দী আগে। জেরুসালেমে বায়তুল আকসা’র গুম্বজটি মুসলমানদের জন্যে তৃতীয় সর্বাধিক পবিত্র স্থান। অথচ এতে শুধু রয়েছে মহানবী (দ:)-এর কদম মোবারকের চিহ্ন, যেখান থেকে তিনি মে’রাজে গমন করেন!
বায়তুল মুকাদ্দাসের গম্বুজ
বায়তুল মোকাদ্দসের এই সুপ্রাচীন গুম্বজসম্বলিত ইসলামী ইমারতটি এখন হুমকির মুখোমুখি, কারণ ওহাবী মতবাদ অনুযায়ী এ ধরনের ইমারত মন্দ বেদআত (উদ্ভাবন)।
বায়তুল মুকাদ্দাসের এইস্থানে মিরাজের রাসূলুল্লাহ (দ:) ঊর্ধ্বগমন শুরু করেন
মে’রাজের গুম্বজটি এর পাশেই অবস্থিত, যেখান থেকে রাসূলুল্লাহ (দ:) ঊর্ধ্বগমন শুরু করেন। ওহাবী মতে, পবিত্র স্থানে এ ধরনের গুম্বজ নির্মাণ ও একে গুরুত্ব প্রদান মন্দ একটি বেদআত এবং তারা শেরকের ভয়ে এটি বুলডজার দিয়ে ধূলিসাৎ করা সমীচীন মনে করে। ইসলামের শত্রুদের শুধু ওহাবী মতাবলম্বীদের হাতে ক্ষমতা দেয়াই বাকি, যা দ্বারা ওহাবীরা মে’রাজের গুম্বজসহ সকল বিদ্যমান ইসলামী ঐতিহ্যবাহী স্থানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে।
যমযম কূপ
যমযম কুয়ার ওপরে গুম্বজ নির্মিত হয় ইসলামের প্রাথমিক যুগে, খলীফা আল-মনসূরের শাসনামলে (১৪৯ হিজরী)। ওহাবী মতবাদ অনুসারে এটিও মন্দ বেদআত ও শেরেকী কর্ম হবার কথা। তাদের কুপ্রথানুযায়ী পৃথিবীতে ঐতিহ্যবাহী আল্লাহর শ’আয়ের তথা স্মারক চিহ্নের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা শেরেকের পর্যায়ভুক্ত হবে। অথচ এই ফেরকাহ’র স্ববিরোধিতার চূড়ান্ত নিদর্শনস্বরূপ খোদায়ী আশীর্বাদধন্য যমযম কুয়ার ওপর ওহাবী-সমর্থক সউদী রাজা-বাদশাহবর্গ-ই ইমারত নির্মাণ করে দিয়েছে।
এক্ষণে আমরা চিরতরে ওপরে উদ্ধৃত ওহাবীদের অপযুক্তির মূলোৎপাটন করবো, এমন কি কবরে আস্তর করা, ওর ওপরে ’মাকতাব’ স্থাপন, বা কবরের ধারে বসার বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত হবে। হাদীসশাস্ত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীস জাল করা এবং কোনো রওয়ায়াতের প্রথমাংশ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যাকারী বাকি অংশগুলোর গোপনকারী হিসেবে ওহাবীদের কুখ্যাতি আছে। কবর আস্তর না করার পক্ষে হাদীস উদ্ধৃত করার পরে আপনারা কোনো ওহাবীকেই কখনো দেখবেন না ইমাম তিরমিযী (রহ:) ও ইমাম হাকিম (রহ:)-এর এতদসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বর্ণনা করতে। পক্ষান্তরে, আমাদের সুন্নীপন্থী ইসলাম ’আওয়ামুন্ নাস’ তথা সর্বসাধারণের সামনে পুরো চিত্রটুকু তুলে ধরতেই আমাদেরকে আদেশ করে, যাতে তাঁরা বুঝতে সক্ষম হন কেন হযরত হাসান আল-বসরী (রহ:), ইমাম শাফেঈ (রহ:) ও ইমাম হাকিম (রহ:)-এর মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ের মেধাসম্পন্ন মোহাদ্দেসীনবৃন্দ এই সব হাদীসকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেননি।
’কবরে আস্তর না করা, না লেখা বা বসা’ সংক্রান্ত হাদীসটি বর্ণনার পরে ইমাম তিরমিযী (রহ:) বলেন:
এই হাদীসটি হাসান সহীহ এবং এটি বিভিন্ন সনদ বা সূত্রে হযরত জাবের (রা:) হতে বর্ণিত হয়েছে। কিছু উলেমা (কাদা) মাটি দ্বারা কবর আস্তর করার অনুমতি দিয়েছেন; এঁদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম হাসান আল-বসরী (আমীরুল মো’মেনেীন ফীল্ হাদীস)। অধিকন্তু, ইমাম শাফেঈ (রহ:) কাদামাটি দ্বারা কবর আস্তর করাতে কোনো ক্ষতি দেখতে পাননি।— সুনানে তিরমিযী, কবর আস্তর না করার হাদীস ,১০৫২
ওহাবীরা তবুও অজুহাত দেখাবে যে ইমাম তিরমিযী (রহ:) তো কাদামাটি দিয়ে কবর আস্তর করতে বলেছিলেন, সিমেন্ট দিয়ে করতে বলেননি। এমতাবস্থায় এর উত্তর দিয়েছেন ইমাম আল-হাকিম (রহ:), যিনি অনুরূপ আহাদীস বর্ণনার পরে বলেন:
এ সকল আসানীদ (সনদ) সহীহ, কিন্তু পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত মুসলমান জ্ঞান বিশারদগণ এগুলো আমল বা অনুশীলন করেননি। কবরের ওপরে ফলকে লেখা মুসলমানদের পরবর্তী প্রজন্ম ‘সালাফ’বৃন্দ থেকেই গ্রহণ করেছিলেন।— মোস্তাদরাক-এ-হাকিম, ১:৩৭০, হাদীসঃ ১৩৭০
সুতরাং এতজন ইসলামী বিদ্বান এই মত পোষণ করার দরুন প্রমাণিত হয় যে ওহাবীরা যেভাবে উক্ত হাদীসগুলোকে বুঝে থাকে, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো সেই অর্থজ্ঞাপক নয়। মনে রাখা জরুরি যে, এই মহান মোহাদ্দেসীনবৃন্দ ওহাবীদের মনগড়া চিন্তাভাবনা থেকে আরও ভালভাবে হাদীসশাস্ত্র সম্পর্কে জানতেন এবং বুঝতেন।
হযরত আম্বিয়া (আ:)-এর মাযার-রওযা আস্তর করার বৈধতা প্রমাণকারী রওয়ায়াতটি হযরত আবূ আইয়ুব আনসারী (রা:) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে; তিনি বলেন:
আমি মহানবী (দ:)-এর কাছে এসেছি, পাথরের কাছে নয়— মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল, হাদীসঃ ২৩৪৭৬
ইমাম আল-হাকিম (রহ:)-ও এটি বর্ণনা করে এর সনদকে সহীহ বলেছেন; তিনি বলেন,
আয্ যাহাবীও তাঁর (ইমাম আহমদের) তাসহিহ-এর সাথে একমত হয়েছেন এবং একে সহীহ বলেছেন।— মোস্তাদরাক আল-হাকিম, আয্ যাহাবীর তালখীস সহকারে ৪:৫৬০, হাদীসঃ ৮৫৭১
এই রওয়ায়াত প্রমাণ করে যে নবী পাক (দ:)-এর রওযা মোবারক আস্তরকৃত ছিল, নতুবা হযরত আবূ আইয়ুব আনসারী (রা:) স্বৈরশাসক মারওয়ানকে খণ্ডন করার সময় ‘পাথর’ শব্দটি ব্যবহার করতেন না। এই আনসার সাহাবী (রা:)-এর রওয়ায়াতটি হযরতে সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর আকীদা-বিশ্বাস ও মারওয়ানের মতো স্বৈরশাসকদের ভ্রান্ত ধারণার পার্থক্যও ফুটিয়ে তোলে (অনুরূপভাবে আমাদের পবিত্র স্থানগুলোও ওহাবীদের মতো স্বৈরশাসক জবরদখল করে রেখেছে, যা তাদের ন্যায়পরায়ণতা সাব্যস্ত করে না; কারণ ইতিপূর্বেও মক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারা এয়াযীদ, হাজ্জাজ বিন ইউসূফ, মারওয়ানের মতো জালেমদের অধীনে ছিল)। মহানবী (দ:)-এর পবিত্র রওযায় কাউকে মুখ ঘষতে দেখে মারওয়ান হতভম্ব হয়েছিল। সে যখন বুঝতে পারে এই ব্যক্তি-ই সাহাবী হযরত আবূ আইয়ুব আল-আনসারী (রহ:), তখন একেবারেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়।
ওহাবীরা অপর যে বিষয়টির অপব্যবহার করে, তা হলো কবরের ধারে বসা। এ প্রসঙ্গে ইমাম মালেক (রহ:) প্রণীত ‘মুওয়াত্তা’ গ্রন্থে একটি চমৎকার হাদীস বর্ণিত হয়েছে, আর এতে ইমাম মালেক (রহ:)-এর নিজেরও একটি চূড়ান্ত মীমাংসাকারী সিদ্ধান্ত বিদ্যমান, যা প্রমাণ করে যে রাসূলুল্লাহ (দ:) সার্বিকভাবে মানুষদেরকে কবরের ধারে বসতে নিষেধ করেননি, বরং পেশাব-মলত্যাগ করতে নিষেধ করেছিলেন; কেননা, ’তা আক্ষরিক অর্থেই কবরবাসীর ক্ষতি করে।’ এই সব হাদীসে ব্যবহৃত ‘আ’লা’ (ওপরে) শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবে ওহাবীরা ভুল বুঝে থাকে, যাতে তাদের ধোকাবাজীর প্রসার ঘটানো যায়।
ইমাম মালেক (রহ:) নিম্নবর্ণিত শিরোনামে গোটা একখানা অধ্যায় বরাদ্দ করেছেন:
”জানাযার জন্যে থামা এবং কবরস্থানের পাশে বসা” – উক্ত অধ্যায়ে বর্ণিত দ্বিতীয় রওয়ায়াতে বিবৃত হয়:
এয়াহইয়া (রা:) আমার (ইমাম মালেকের) কাছে বর্ণনা করেন মালেক (রা:) হতে, যিনি শুনেছিলেন এই মর্মে যে, হযরত আলী ইবনে আবি তালেব (ক:) কবরে মাথা রেখে পাশে শুয়ে থাকতেন। মালেক (রা:) বলেন, ‘আমরা যা দেখেছি, কবরের ধারে পেশাব-মলত্যাগ করার ক্ষেত্রেই কেবল নিষেধ করা হয়েছে’।— মুওয়াত্তা-এ-ইমাম মালেক, ১৬তম বই, অধ্যায় ১১, হাদীস ৩৪
মনে রাখা জরুরি, অনেক ইসলামী পণ্ডিতের মতে বোখারী শরীফ হতে ইমাম মালেক (রহ:)-এর ’মুওয়াত্তা’ গ্রন্থটি অধিক কর্তৃত্বসম্পন্ন।
কুরআন মজীদে যেমন এরশাদ হয়েছে:
আল্লাহ তা (কুরআন মজীদ) দ্বারা অনেককে গোমরাহ (পথভ্রষ্ট) করেন এবং অনেককে হেদায়াত (পথপ্রদর্শন) করেন।— আল-কুরআন, ২:২৬
যদি কুরআন মজীদ পাঠ করে মানুষেরা গোমরাহ হতে পারে (যেমনটি হয়েছে ওহাবীরা), তাহলে একইভাবে হাদীস শরীফও যথাযথভাবে বিশেষজ্ঞদের অধীনে পাঠগ্রহণ না করে অধ্যয়নের চেষ্টা করলে তা দ্বারা মানুষজন পথভ্রষ্ট হতে পারে।
এ কারণেই মহান সালাফ আস্ সালেহীন (প্রাথমিক যুগের পুণ্যাত্মাবৃন্দ) ইমাম সুফিয়ান ইবনে উবায়না (রহ:) ও ইবনে ওহাব (রহ:) কী সুন্দর বলেছেন:
সুফিয়ান ইবনে উবায়না (রহ:) বলেন,
হাদীসশাস্ত্র পথভ্রষ্টতা, ফকীহমণ্ডলীর মধ্যস্থতা ব্যতিরেকে।
ইবনে ওহাব (রহ:) বলেন,
হাদীসশাস্ত্র গোমরাহী, উলেমাবৃন্দের মধ্যস্থতা ব্যতিরেকে।— উদ্ধৃতিটি ইমাম কাজী আয়ায কৃত ‘তারতীব আল-মাদারিব’ গ্রন্থের ২৮ পৃষ্ঠায় বিদ্যমান
অধিকন্তু, ইমাম আবূ হানিফা (রহ:)-কে একবার বলা হয়, ‘অমুক মসজিদে তমুক এক দল আছে যারা ফেকাহ (ইসলাম ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কিত সূক্ষ্ম জ্ঞান) বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে।’ তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তাদের কি কোনো শিক্ষক আছে?’ উত্তরে বলা হয়, ‘না।’ এমতাবস্থায় হযরত ইমাম (রহ:) বলেন, ‘তাহলে তারা কখনোই এটি বুঝতে সক্ষম হবে না।’— ইবনে মুফলিহ রচিত ‘আল-আদাব আশ্ শরিয়াহ ওয়াল্ মিনাহ আল-মারিয়া’, ৩ খণ্ডে প্রকাশিত, কায়রোতে পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ, মাকতাবা ইবনে তাইমিয়া, কায়রো, ১৩৯৮ হিজরী/১৯৭৮ খৃষ্টাব্দ, ৩:৩৭৪
অতএব, এক্ষণে ওহাবীদের পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে ভাবুন, যাদের হাদীসশাস্ত্র-বিষয়ক প্রধান হর্তাকর্তা নাসের আদ্ দালালাহ মানে আলবানীর এই শাস্ত্রে কোনো এজাযা ও স্তর-ই নেই; ঘুরে ঘুরে ফতোয়াদাতা সাধারণ ‘সালাফী’দের কথা তো বহু দূরেই রইলো!
দলিল নং – ২
মহান হানাফী আলেম মোল্লা আলী কারী তাঁর চমৎকার ’মিরকাত শরহে মিশকাত’ গ্রন্থে লেখেন:
সালাফ তথা প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ প্রখ্যাত মাশায়েখ (পীর-বোযর্গ) ও হক্কানী উলেমাবৃন্দের মাযার-রওযা নির্মাণকে মোবাহ, অর্থাৎ, জায়েয (অনুমতিপ্রাপ্ত) বিবেচনা করেছেন, যাতে মানুষেরা তাঁদের যেয়ারত করতে পারেন এবং সেখানে (সহজে) বসতে পারেন।— মিরকাত শরহে মিশকাত, ৪র্থ খণ্ড, ৬৯ পৃষ্ঠা
মহান শাফেঈ আলেম ও সূফী ইমাম আব্দুল ওয়াহহাব শারানী (রহ:) লেখেন:
আমার শিক্ষক আলী (রহ:) ও ভাই আফযালউদ্দীন (রহ:) সাধারণ মানুষের কবরের ওপরে গুম্বজ নির্মাণ ও কফিনে মৃতদের দাফন এবং (সাধারণ মানুষের) কবরের ওপরে চাদর বিছানোকে নিষেধ করতেন। তাঁরা সব সময়-ই বলতেন, গুম্বজ ও চাদর চড়ানোর যোগ্য একমাত্র আম্বিয়া (আ:) ও মহান আউলিয়া (রহ:)-বৃন্দ। অথচ, আমরা মনুষ্য সমাজের প্রথার বন্ধনেই রয়েছি আবদ্ধ।— আল-আনওয়ারুল কুদসিয়্যা, ৫৯৩ পৃষ্ঠা