সুস্পষ্ট হাদীস শরীফ
মসজিদ আল-খায়ফ (মিনায় অবস্থিত)
মজমাউয্ যাওয়াইদ
হযরত ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি বলেন:
মসজিদে আল-খায়ফের মধ্যে (’ফী’) ৭০ জন নবী (আ:)-এর মাযার-রওযা (এক সাথে) বিদ্যমান।
ইমাম আল-হায়তামী (রহ:) বলেন যে এটি আল-বাযযার বর্ণনা করেন এবং ”এর সমস্ত রাবী (বর্ণনাকারী)-ই আস্থাভাজন”। মানের দিক থেকে এই হাদীস সহীহ। ইমাম আল-হায়তামী (রহ:) নিজ ‘মজমাউয্ যাওয়াইদ’ পুস্তকের ৩য় খণ্ডে ‘বাবু ফী মসজিদিল্ খায়ফ’ অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ #৫৭৬৯ নং হাদীসটি উদ্ধৃত করেন, যা’তে বিবৃত হয়:
মসজিদে খায়ফের মধ্যে (’ফী’) ৭০ জন আম্বিয়া (আ:)-এর মাযার-রওযা বিদ্যমান।
হুকুম: শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:) এ প্রসঙ্গে বলেন,
এই হাদীসের সনদ সহীহ।— মোখতাসারুল বাযযার, ১:৪৭৬
আল-কুরআন ও হাদীস শরীফের এই সমস্ত ‘নস’ তথা দালিলিক প্রমাণ থেকে পরিস্ফুট হয় যে আম্বিয়া (আ:) ও আউলিয়া (রহ:)-বৃন্দের মাযার-রওযায় ইমারত নির্মাণ করা ইসলামে বৈধ ও সওয়াবদায়ক কাজ। সীমা লঙ্ঘনকারীরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদেরকে ’মুশরিকীন’ বা মূর্তিপূজারী বলে আখ্যা দেয় এই বলে যে মাযার-রওযাগুলো হচ্ছে ‘মূর্তির ঘর’ (নাউযুবিল্লাহ); আর তাই বুযূর্গানে দ্বীনের মাযার, এমন কি মহানবী (দ:)-এর রওযা শরীফও ধ্বংস করতে হবে বা মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। জান্নাতে বাকী ও মু’য়াল্লায় বহু সাহাবা-এ-কেরামে (রা:)-এর মাযার-রওযা এভাবে তারা গুঁড়িয়ে দেবার মতো জঘন্য কাজ করেছে। কিন্তু মুসলমানদের চাপে তারা হুযূর পূর নূর (দ:)-এর রওযা শরীফ ভাঙ্গতে পারেনি।
আল-কুরআনের ২য় ‘নস’(দলিল)
|
কবর
|
|
* মাযার
|
|
* যিয়ারাত
|
|
* মাযার
নির্মাণ
|
আল্লাহ পাক তাঁর পবিত্র কুরআনে এরশাদ ফরমান:
এবং স্মরণ করুন, যখন আমি এ ঘরকে (কা’বা শরীফকে) মানবজাতির জন্যে আশ্রয়স্থল ও নিরাপদ স্থান করেছি; আর (বল্লাম), ‘ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে (মাকামে ইবরাহীম নামের পাথরকে যার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি কা’বা ঘর নির্মাণ করেন) নামাযের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো’; এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে তাকিদ দিয়েছি, ‘আমার ঘরকে পুতঃপবিত্র করো, তাওয়াফকারী, এ’তেকাফকারী এবং রুকু’ ও সেজদাকারীদের জন্যে।” (জ্ঞাতব্য: তাওয়াফের পরে দু’রাকআত নামায ওখানে পড়তে হয়)— সূরা বাকারাহ, ১২৫ আয়াত, মুফতী আহমদ এয়ার খানের ’নূরুল এরফান’ বাংলা তাফসীর থেকে সংগৃহীত; অনুবাদক: মওলানা এম, এ, মন্নান, চট্টগ্রাম
আল-কুরআনের অন্যত্র এরশাদ হয়েছে:
সেটির মধ্যে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি রয়েছে – ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থান (মাকাম-এ-ইব্রাহীম); আর যে ব্যক্তি সেটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, সে নিরাপত্তার মধ্যে থাকে; এবং আল্লাহর জন্যে মানবকুলের ওপর ওই ঘরের হজ্জ্ব করা (ফরয), যে ব্যক্তি সেটি পর্যন্ত যেতে পারে। আর যে ব্যক্তি অস্বীকারকারী হয়, তবে আল্লাহ সমগ্র জাহান (জ্বিন ও ইনসান) থেকে বে-পরোয়া।— সূরা আল-এ-ইমরান, ৯৭ আয়াত, মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ‘নূরুল এরফান’ তাফসীর হতে সংগৃহীত
আল্লাহতা’লা তাঁর প্রিয় বন্ধুদের এতো ভালোবাসেন যে ‘এই ধরনের নির্দিষ্ট বা চিহ্নিত করা স্থানে’ প্রার্থনা করাকে তিনি হজ্জ্বের প্রথা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এতে যদি বিন্দু পরিমাণ শেরকের (অংশীবাদের বা মূর্তিপূজার) সম্ভাবনা থাকতো, অর্থাৎ, মানুষেরা আম্বিয়া (আ:)-এর মাযার-রওযা ও পদচিহ্নকে ‘আল্লাহ ভিন্ন অন্য উপাস্য দেবতা’ হিসেবে যদি গ্রহণ করা আরম্ভ করতো, তাহলে আল্লাহতা’লা নিজ কুরআন মজীদে তাঁর অবারিত রাজসিক সম্মান তাঁরই প্রিয় বন্ধুদের প্রতি দেখাতেন না।
বস্তুতঃ পবিত্র কুরআন মজীদ এই সব স্থানকে ‘শআয়েরুল্লাহ’ (আল্লাহকে স্মরণ হয় এমন সম্মান প্রদর্শনযোগ্য চিহ্ন) হিসেবে সম্বোধন করে; আর আম্বিয়া (আ:) ও আউলিয়া (রহ:)-বৃন্দের মাযার-রওযা (নবীদের কারো কারো রওযা মসজিদে হারামের মধ্যেও বর্তমান) অবশ্যঅবশ্য শআয়েরুল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত। যে কেউ এই মাযার-রওযার ক্ষতি করলে প্রকৃতপ্রস্তাবে আল্লাহতা’লার সাথেই যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে, যেমনটি সহীহ বেখারী শরীফে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসীতে ঘোষিত হয়েছে:
যে ব্যক্তি আমার ওলী (বন্ধু)’র প্রতি বৈরীভাবাপন্ন হয়, তাকে আমি আমার সাথে যুদ্ধ করার জন্যে আহ্বান জানাই।— সহীহ বোখারী, হাদীসে কুদসী, ৮ম খণ্ড, ১৩১ পৃষ্ঠা
বিরোধীরা হয়তো ধারণা করতে পারে যে তারা হয়তো মাযার-রওযা ভেঙ্গে কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর সাথে যুদ্ধে জয়ী হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে আল্লাহতা’লা ওহাবী/’সালাফী’ গোষ্ঠীর নিষ্ঠুর ও বর্বরতা প্রকাশ করে দিয়ে আহল্ আস্ সুন্নাহ’র শিক্ষাকেই সারা বিশ্বে প্রচার-প্রসার করছেন। সীমা লঙ্ঘনকারীদের জঘন্য কাজের পরে আহল্ আস্ সুন্নাহ (সুন্নী মুসলমানবৃন্দ) বিশ্বব্যাপী গোমরাহদের বদ আকীদার খণ্ডন করছেন, এবং আল-হামদু লিল্লাহ, এটি নিশ্চয় আল-ফাতহুল বারী (খোদাতা’লার বিজয় তথা তাঁর পক্ষ হতে বিজয়), যা সীমা লঙ্ঘনকারীরা উপলব্ধি করতে পারছে না। আল্লাহ হলেন সবচেয়ে সেরা পরিকল্পনাকারী এবং তিনি তাঁর সালেহীন বা পুণ্যবান বান্দাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী লোকদেরকে জমিনের ওপর তাদের ধ্বংসযজ্ঞ/নৈরাজ্য চালানোর ক্ষণিক সুযোগ দেন; কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রতি আল্লাহর লা’নত বা অভিসম্পাত বর্ষিত হয়, যেমনটি আল-কুরআন এরশাদ ফরমায়:
এবং ওই সব লোক, যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকারকে তা পাকাপাকি হবার পর ভঙ্গ করে, এবং যা জুড়ে রাখার জন্যে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, সেটি ছিন্ন করে এবং জমিনে ফাসাদ ছড়ায়, তাদের অংশ হচ্ছে অভিসম্পাত-ই এবং তাদের ভাগ্যে জুটবে মন্দ আবাস-ঘর।— সূরা রা’দ, ২৫ আয়াত
অতএব, এ ধরনের লা’নতপ্রাপ্ত লোকেরা জমিনের ওপর ফাসাদ (বিবাদ-বিসম্বাদ) সৃষ্টি করে এবং পবিত্র স্থানগুলো ধ্বংস করে। তারা মনে করে যে তারা সত্যপথে আছে, কিন্ত বাস্তবে খারেজী-সম্পর্কিত আল-বোখারীর হাদীসে যেমন প্রমাণিত, ঠিক তেমনি তারাও খারেজীদের মতোই পথভ্রষ্ট হয়েছে।
আল্লাহতা’লা এরশাদ করেন,
নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু; সুতরাং তোমরাও তাকে শত্রু মনে করো। সে তো আপন দলকে এ জন্যেই আহ্বান করে যেন তারা দোযখীদের অন্তর্ভুক্ত হয়— সূরা ফাতির, ৬ আয়াত
। ইমাম আহমদ আল-সাবী (রহ:) ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (রহ:)-এর কৃত ‘তাফসীরে জালালাইন’ গ্রন্থের চমৎকার হাশিয়ায় এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন:
এ কথা বলা হয় যে এই আয়াতটি খারেজীদের (ভবিষ্যতে আবির্ভাব) সম্পর্কে নাযেল হয়েছিল, যারা কুরআন-সুন্নাহ’র অর্থ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পরিবর্তন করেছিল এবং এরই ভিত্তিতে মুসলমান হত্যা ও তাঁদের ধন-সম্পত্তি লুঠপাটকে বৈধ জ্ঞান করেছিল, যেমনটি আজকাল দেখা যায় তাদের উত্তরসূরী হেজায অঞ্চলের ওহাবীদের মাঝে। ওহাবীরা ‘এ কথা মনে করছে তারা (বড় কূটনীতিমূলক) কিছু করেছে। ওহে শুনছো, নিশ্চয় তারাই মিথ্যুক। তাদের ওপর শয়তান বিজয়ী হয়ে গিয়েছে, সুতরাং সে তাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে আল্লাহর স্মরণ। তারা শয়তানের দল। শুনছো! নিশ্চয় শয়তানের দল-ই ক্ষতিগ্রস্ত’ (আল-কুরআন, ৫৮:১৮-৯)। আমরা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি যাতে তিনি তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেন।— হাশিয়া আল-সাবী আ’লাল জালালাইন, ৩:২৫৫
জরুরি জ্ঞাতব্য: ওহাবীরা ধূর্ততার সাথে এই বইটির মধ্য থেকে ‘ওহাবী’ শব্দটি অপসারণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা হাতে-নাতে ধরা পড়ে যায়। আল্লাহতালা-ই ইসলামী জ্ঞানকে হেফাযত করেন।